শনিবার, ১ এপ্রিল, ২০১৭

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে


রাতে, যখন প্রজাপতি তারাটা ডুবে যায়, তখন আমার রাত শুরু হয়। তার আগ পর্যন্ত মানতে কষ্ট হয়, আমি বেঁচে আছি। নিজেকে অপমান করতে ইচ্ছে হয়। এসব খেয়াল। প্রয়োজন নেই এসবের। আমার প্রয়োজন স্বেচ্ছাচারী হয়ে বেঁচে থাকা। স্বেচ্ছাচারিতা আমাকে আনন্দ দেয় না, দুঃখ দেয়। তবে সেটা আমাকে আর সবার সাথে তাদের মত হয়ে মিশতে সাহায্য করে। এমন করে দেয়, যাতে কিছু কাছের মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে বলতে পারে, "কটা দিন আগেও তুই অনেকটা ভালো ছিলি। এখন কেমন যেন হয়ে গেছিস।" এই যে কয়টা দিন আগের গল্প, সেটা চলছে, এবং চলতে থাকবে অনেকক্ষণ, অনেকটা বছর ধরে, বারবার। নানা জনের কাছ থেকে নানাভাবে এই বাক্যটা শুনতে শুনতেও অভ্যস্ত হতে পারিনি। অস্বস্তি নিয়ে বারবার শুনছি, শুনে যাচ্ছি।
এই আকাশে আমার কি মুক্তি আদৌ আছে? আমার আকাশগুলো সবসময়ে ঝাপসা হয়ে আসে এসবে, এসব দুঃখে। আমি কোনগুলোকে আলো বলব? কোন আলো তো কোথাও সেকেলে, কোথাও অন্ধকার। আলোর খোঁজ তবে কেমন করে করতে হয়? আমাকে জানতে হবে।

সোমবার, ২০ মার্চ, ২০১৭

দুঃখ-হিংসা-বেদনা

প্রেম শব্দটা সত্যি গোলমেলে। ঠিক কতটুকুকে আমরা প্রেম বলব, কতটুকুকে ভালোবাসা বলব, তার কোন মাপ নেই। আর সেই মাপের প্যাচের অভাবেই সবকিছুর সীমানা ওভারল্যাপিং করে বসে আছে। আমরা সেই সীমানার খোঁজে আকুল হই। বন্ধুত্ব আর প্রেমের ব্যাপারটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমরা ছাঁচে বাধতে চাই, আলাদা করতে চাই। কিন্তু এটা কতটা আলাদা? ফ্রয়েডিয়ান সাইকোলজির যে অংশগুলো নিয়ে আমরা কৌতুক করে থাকি, সে অংশগুলো আমার মানতে ইচ্ছে করে। এগুলো আলাদা করা খুব কঠিন।

হিংসা দিয়ে হয়ত বোঝা যাবে। পছন্দের মানুষকে অন্য কারো সাথে প্রেমালাপে মত্ত বা সেরকম কিছু দেখলে বুক কষ্টে ফেটে যায়। এখানে ফ্রয়েড একদম ঠিক। এই যে এমা ওয়াটসন, রুপার্ট গ্রিনকে যে দৃশ্যে চুমু খায়, আমার সত্যি বুকে ব্যাথা করছিল। কাউকে কারো সাথে দুষ্টুমির ফ্ল্যার্ট করতে দেখলেও ইচ্ছে হয় চুবিয়ে মারি ছেলেটাকে।

শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

সিরিঞ্জ


'হ্যালো রুদ্র!', ফোনের ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর।
রুদ্রের মনে পড়ে যায় অনেক পুরনো একটা বাক্য। 'তুমিইতো রুদ্র, যে দৌড়াতে পারে'। একজনের পরিচয় হিসেবে দৌড়াতে পারা বেশ অস্বস্তিকর। রুদ্রের একটা পদক আছে জাতীয় স্প্রিন্টে। তাই বলে দৌড়াতে পারে- এমন করে অপরিচিত একটা মেয়ে বলে বসলে বিরক্ত হবার কথা তার। কিন্তু রুদ্র বিরক্ত হতে পারেনি সেদিন। তবে আজ সন্ধ্যার একটু পরে ব্যাচেলর ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়া সেই পুরনো কণ্ঠস্বর কিছুটা বিরক্তি জাগায়। রুদ্র ছোট্ট করে উত্তর করে, 'বলছি'। ওপাশ থেকে টেনে টেনে কণ্ঠস্বর বলে, 'আমি মিলি'। মিলির পরিচয় ঠিক এখানে শুরু নয়। ফিরতে হবে সেই দিনে। সেদিনও একটা কণ্ঠস্বর ছিল এই মিলি। পেছন থেকে বলেছিল, 'তুমিইতো রুদ্র, যে...'। সেটা ছিল বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র উৎসব, পাবলিক লাইব্রেরীর শওকত ওসমান মিলনায়তনে। চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র, আর পেছন থেকে ডাক শুনেছিল মিলির। আজ যেমন 'চিনেছি' বলার আগে বিরক্তি কাটাতে রুদ্র একটু সময় নেয়, সেদিনও এরকম সময় নিয়েছিল। কৌতূহল কাটাতে। এরপর ধীরে ধীরে ঘুরে তাকিয়ে বলেছিল, 'হ্যাঁ। এবং আমি হামাগুড়ি দিতেও জানি'

'মার্কস লোকটা কেমন?' ফোনের ওপাশ থেকে কথা শুরু হয়।

বুধবার, ৮ মার্চ, ২০১৭

নারী দিবসঃ আমার শ্রদ্ধা আমার ভাবনা


আমার ভাবির যেদিন মেয়ে হয়, সেদিনকার কথা। আমি শুনলাম কথাটা, অনেক দূরে বসে, এবং ধ্বক করে উঠল বুক। মেয়ে! আবারো সেই ভোগান্তি!
আমাদের জন্য ভোগান্তি নয়, কিন্তু আমি যতই অস্বীকার করি, আমার প্রিয়তমা ভাতিজীর জন্য সেটা ভোগান্তির হবেই। ওর জীবনের নানারকম কষ্টের একমাত্র কারণ হবে ও নারী। এবং সেই কষ্টগুলোর প্রতিটির পেছনে কাজ করবে অন্য কারো অন্যায়। আমরা সেটা সহ্য করব। প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে সয়ে আসছি।

বাণী গল্প রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন যেভাবে-
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব'লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।
তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই-- আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।
 

আচ্ছা, একটা বখাটের দল যখন রাস্তায় হেঁটে যাওয়া একটা মেয়ের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে, তখন মেয়েটার কেমন লাগে? আমি সাইকোলজির ছাত্র নই, আমার ওসব বোঝার সত্যিকারের ক্ষমতাটা নেই। আসলে, পুরুষ হয়ে জন্মানোয় আর কখনো ওটা জানার সুযোগ হবে না। এবং এই বিশ্রী স্বাদটা নেবার ইচ্ছে কারো শখে জাগবেও না কখনো। কিন্তু সেই পুরুষগুলো? যাদের চোখ জ্বলজ্বল করে, কিংবা ঠোট ভিজে ওঠে? ওদের কখনো মনে হয়েছে কথাগুলো?

ভারতীয় একটা সাইটে দেখলাম ওঁরা লিখেছে,
মেয়েদের এটা করা উচিৎ না,
মেয়েদের ওটা করা উচিৎ না...
আসলে মেয়েদের এসব চুতিয়াদেরকে জন্ম দেয়াই উচিৎ না যারা এসব বলে। 

এটা তাঁরা ছেপেছে কৌতুকের মত করে ইলাস্ট্রেশন করে। আসলে মেয়েরা মা হন বলে তাঁরা এত মহৎ হয়ে পড়েন। যে ছেলেটা ঐসব অশ্লীল কথা সাবলীল ভঙ্গিতে বলে যেতে পারে সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেয়েটাকে নিয়ে, তার কখনো মনে পড়ে না, তার মা একসময় তরুণী ছিলেন, এবং তার মত অনেক ছেলেরা ঠিক ঐভাবে ঐ মন্তব্যগুলো করেছে তাঁকে নিয়ে। সেই মা কখনো জানতে পারেন না, তরুণী থাকতে যে শব্দগুলো তাঁকে সবচেয়ে কষ্ট দিয়েছে জীবনে, সেই শব্দগুলো তাঁর ছেলে বাইরে অবলীলায় উচ্চারণ করে কোন মেয়েকে কুঁকড়ে দিয়ে অট্টহাসিতে মেতে উঠেছে, এবং ঘরে এসে অবলীলায় ভাত গিলছে। মায়ের কথাটা ভাবলে হয়ত ভাতগুলো গলায় আটকে যেত। 

সাম্যতা বা স্বাধীনতার অর্থ কিন্তু আমরা আজকাল প্রায়ই গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু সেই গুলিয়ে ফেলবার অনেক আগে, একদম শুরুতেও কিন্তু আমরা বৈষম্য টেনে আনি। ধরুন আমার বাবা যদি আমাকে আজ ফোন করে বলেন, 'তুমি লিখেটিখে কিছু টাকা পাও না? আগামী মাসে আমাকে দেড় কোটির মত টাকা দিও তো, জমি কিনব একটা।' আমি কি তখন হাসব? আমাকে যদি বলা হত ভাতিজার জন্য চিপস কিনে এনো, কিংবা মায়ের জন্য এক কেজি আপেল এনো, সেটা স্বাভাবিক ছিল। সেটা হয়। কিন্তু কেমন করে আমি দেড় কোটি জোগাড় করব? সামর্থের প্রশ্ন আসে এতে। কিন্তু সেই সামর্থ্য কি আমার আছে? এক মাসে সেই টাকা জোগাড় করার মত সামর্থ্যও কি আমার আছেনেই। আমরা সাম্যতার বিচার করব শারিরীক-মানসিক সামর্থ্য দিয়ে। 

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

গাউন





এক.
মধুর ক্যান্টিনে চা ফুঁকছি। একলা বসে, অসময়ে। ব্যাপারটা সিগারেটের মত, ক্যাফেইন নেবার পদ্ধতি, তবে এতে ফুসফুসের জোরে কিছু বাতাস বের করে দেয়া হয়, চা কে ঠাণ্ডা করতে। বসেছি কাউন্টারের সামনের টেবিলটায়, ভিড়ভাট্টা নেই একদম। আমার চোখ বারবার যাচ্ছে ঐ ওপাশের টেবিলটাতে, যেখানটায় একটা মেয়ে বসে আছে। কিছু খাচ্ছিল হয়তবা, কিংবা কারো জন্য অপক্ষা করছে। হয়তবা বেকার সময়ই কাটাচ্ছে। আমার শেষটা ভাবতেই বেশি ভালো লাগছে। কারন ফুটফুটে চেহারার মেয়েটাও বেশ কবার চেয়েছে এদিকটায়। আমি চা শেষ করলাম, এবং আর এক কাপ চা নিলাম। ফ্রয়েড ভক্তরা এর একরকম ব্যাখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু আমার চায়ের নেশা, তাই তৃতীয় কাপ।

চা শেষ করে আমি বিল মিটিয়ে সোজা হেঁটে গেলাম সেই টেবিলটায়। বললাম, তুমি কি জানো, বিল ক্লিনটন ঠিক এ পরিস্থিতিতে কী বলেছিলেন?
মিষ্টি করে মেয়েটা হাসল, আলতো করে মাথা নাড়ল। বলল, লিভিং হিস্ট্রি-র গপ্পো।
আবারো বলল, আমি অরুণা।
আমি কশ্যপ।
এবারে শব্দ করে হাসল অরুণা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো সত্যিকারের নামটা জানতে। বললাম, আমি রাহি।
-ফাইন আর্টস, ফার্স্ট ইয়ার।
-ফিজিক্স, ফার্স্ট ইয়ার।
আমি ফিজিক্সের ছাত্র হয়ে কক্ষনো অধিকার রাখি না মায়াবতি এক ফাইন আর্টসের ছাত্রীর দিকে তাকাতে। পুরো ক্যাম্পাসের বহু সিনিয়রের চোখ সবসময় চোরা দৃষ্টি ফেলে এই ডিপার্টমেন্টের প্রতি। তবু আমি হেসে বলি, আমরা বের হতে পারি। কল্পনার মত সুন্দর করে মাথা নাড়ে অরুণা। আমরা বের হই মধু থেকে।

-একলা চুপচাপ বসে ছিলে যে? অপেক্ষা?

বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

চোখ যখন নিরুপায়

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই আমি চোখ থেকে চশমাটা খুলে নেই। হাতে নিয়ে হাঁটি। নইলে দূরে বসে থাকা কোন সুন্দরীর পানে চোখ আটকে যায়। আমি প্রাণপণে চেষ্টা করেও যখন চোখ ফেরাতে পারি না, ঠিক তখনই চশমাটা খুলে নেই। নিজেকে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিয়ে আমি  মুক্তি নেই।
ব্যপারটা প্রায়ই ঘটছে আজকাল। কোন বান্ধবীকে পছন্দ, চোখ আটকে যাবে। দূরে কাউকে দেখেও চোখ আটকে যাবে। নৈতিকতার অবক্ষয়, নাকি হৃদয়ের কল্পলোকের পরিস্ফুটন? হয়তবা বিস্ফোরণ।

আমি সবসময়ে আমি হতে চেয়েছি। এলো চুল আমার পছন্দের। কাঁধে শাল ঝুলিয়ে হাঁটতে আমার বেশ লাগে। চশমার কাচ ঘোলা হয়ে আসে প্রায়ই, অযত্নে। সেসবে ঢের আপত্তি সবের। প্রেমের জন্য চিঠি লিখতে জানা আমার কাছে আধুনিকতা, সবের কাছে মধ্যযুগীয় ভাবনা। আমার আমি হওয়ায় মানুষের যত আপত্তি আছে, সেগুলোকে আমি প্রায়ই থোড়াই কেয়ার করি। কিন্তু সবসময়ে পারি না।

আহমাদ বলে, মেয়েমানুষ দুরকমের। মায়ের জাত, আর প্রেমিকার জাত। চেনার সরল উপায় হল, প্রেমিকার জাতে বড় চুল ভালোবাসে। আর মায়ের জাতের কাছে বড় চুল অসহ্য, চক্ষুশূল।  আমি ক্লাসের শুরুর দিনগুলোতেই ভাগ দুটো ঠিক ঠিক করে ফেলেছিলাম। কারণ তখন আমার চুলগুলো ছিল ঝাঁকড়া এবং দীর্ঘ। কাঁধে শাল চড়িয়ে ক্লাসে যাই, বসি সবার সামনে। একদিন একজন শিক্ষিকা, যিনি একজন মাও বটে, বললেন ওসব চলবে না। আমার বান্ধবীদের মাতৃত্ববোধ বেরিয়ে এল। ওরা বলল, তোমাকে শাল ছাড়তে হবে, চুল কাটতে হবে। একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে চলল, তুমি কেন এমন থাকো? আমি তখন আশেপাশে তাকিয়ে অসহায়ের মত করে মাথা নাড়লাম। আমার নিষ্ঠুর ছেলে বন্ধুগুলো আগেই রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। কান্না কান্না চোখে ভাবছি, এরা সবে কি মায়ের জাত? যেমন ছিল ঈশিতা আর রূপা। তখন দেহে প্রাণ ফিরে আসে। মীম বলে, ছেড়ে দে না ওকে। ও যেমন থাকতে চায় তেমনই থাকুক। আমি মীমের প্রতি প্রাণ ভরা কৃতজ্ঞতা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসি।

এবং বিকেলে আমাদের ফজলুল হক মুসলিম হলের পুকুরপাড়ের সেলুনে গিয়ে বলি, চুলগুলো একদম ছোট করে ফেলুন। বেরিয়ে আসতে সোহাগ, শান্ত, আসাদুজ্জামান বলে, এবার একদম ঠিক আছে। আমার ইচ্ছে করে ওদের টুঁটি ছিঁড়ে ফেলি। পরদিন ক্লাসে যাই গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে।

রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম আনন্দভ্রমণে

 দূর-দূরান্তে ঘুরবার আগ্রহ আমার বহুকালের। কখনো একলা ঘুরতে ভালো লাগে, কখনোবা অনেকের সাথে। শুধু দূরে নয়, দিনভর আশেপাশে কাজে-অকাজে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাসটাও আমার খুব বেশি। কম খাওয়া, না খাওয়া আমার প্রায় শূন্য ওজনের একটা কারন হতে পারে, তবে অন্য কারণটা হল দিনভর ছুটে বেড়ানো। যা খাই, তার অনেকটা দখল করে নেয় আমার ভ্রমণপিয়াসু কর্মকান্ড।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অধ্যায়ন এর শুরু ২০১৭ সালের শুরুতে। আর জানুয়ারিতেই একটা পিকনিক পেয়ে যাওয়া রীতিমত অভাবনীয়। অল্প কয়জনের দেখলাম আগ্রহ নেই এটা নিয়ে তেমন। বাকিরা সবাই মুখিয়ে থাকলাম পিকনিকের তারিখের জন্য। উপরি পাওনা দুদিনের ছুটির ব্যপারটাও মাথায় ছিল সবার। এবং এজন্য যে অতি অপ্রিয় দুটি ক্লাস মিস হবে, সে আনন্দও সচেতনভাবে পাচ্ছিলাম।

আমরা প্রায়ই টিএসসিতে বসি আড্ডা দিতে। সে আড্ডা কখনো বারান্দায় পা বিছিয়ে, কখনো ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলে গোল হয়ে, কখনো বাইরের পার্কিং লটে, কিংবা ভেতরের লনে বসে। সে আড্ডায় সব বিষয়কে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি আসে বন্ধুকে রসাত্মক আক্রমণ। সে আক্রমণের বিষয়বস্তুগুলো সবসময়েই হয় নির্মম, এবং কখনোবা ছাপার অযোগ্য। এছাড়া পড়াশুনার কথা, বইয়ের কথাও কখনো ঘুরেফিরে উঁকি দেয় আমাদের আড্ডায়। সে আড্ডার প্রতিটা মূহুর্ত সবার জন্য আনন্দ উদ্দীপক। আমরা পিকনিকের জন্য মুখিয়ে ছিলাম, হয়তবা পিকনিকে এই আড্ডার আনন্দের বিস্ফোরিত রূপ কপালে জুটবে বলে।

দিনটি ছিল ২৩ জানুয়ারি, প্রথম বর্ষের ছেলেপুলেকে আসতে বলা হয়েছে ভোরবেলাতেই। আমাদের সেসবের বুঝি তেমন তোয়াক্কা ছিল না। হেলেদুলে দুজন, চারজন করে এসে জড়ো হতে লাগল অনেকটা সময়। এসেছেন শিক্ষকেরা, বড়রাও। সবাই মিলে বাসে ওঠার আগে বাধ্যতামূলক ফটোসেশন। অবশ্য সেটাকে সেলফি সেশন বললে তেমন অপরাধ হবে না। এর ফাঁকে পিলো পাসিং খেলার জন্য আনা বালিশটা ধার করে আমি আমাদের ভবনের নিচতলার ওয়েটিং বেঞ্চিতে ঘুমাবার আয়োজন খুঁজি। কিন্তু শোয়ার একটু পরেই এক বেরসিক ছেলে এসে জানায়, বালিশটা এক বড় আপুর বাসা থেকে আনা। কোথায় কী! আমি বালিশ নিয়ে ভো দৌঁড়। রিংকিকে ফিরিয়ে দিয়ে বলি, আমি ভেবেছি বালিশটা তোর। এরপরে সবাই মিলে সেলফি তুলতে শুরু। মেয়েদের কেউ শাড়ি না পরায় আমিও পাঞ্জাবি পরিনি। তবে আয়াত সেসবের তোয়াক্কা না করে ঝলমলে পাঞ্জাবি গায়ে হাজির। তখন মনে হল, আমি কী দোষ করেছিলামরে বাবা!

সেলফিতে মেয়েরা দেখা দেয় শহরের সকল আটা-ময়দার সংগ্রহ নিয়ে। আর আমরা প্রায় সবাইই এলোমেলো সেই ভঙ্গিতে। মিলনের ব্যাগ থেকে বেরোয় সেলফি-স্টিক নামের অতি অদ্ভুত এক উদ্ভাবন।

শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিনগুলো

অনেক ছোটবেলা থেকে ইচ্ছে হত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। কখনো মনে হত পড়ব বাংলায়, কখনোবা সাংবাদিকতায়। অঙ্কে পড়তে ইচ্ছে হয়েছে, ইচ্ছে ছিল বোটানি পড়বারও। ইচ্ছেগুলো কখনো ফানুসের জন্য জমে থাকেনি, আগ্রহগুলো ছুটেছে স্রোতের মত।

যখন নির্দিষ্ট করে ভাববার সময় হল, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ  নামে একটা বিষয় পড়ব বলে সিধে হলাম। সেই শখের চ্যারিটি করে বেড়ানো, ইউনিসেফের হয়ে গ্রাম গ্রাম ধরে বদলে দেবার স্বপ্ন, সেসব জেঁকে বসে খুব করে। কিন্তু সেখানে পড়া হবেনা, কঠোর সব পরামর্শ। আমি ঘাড় কাত করে সব শুনে যাই। তারপর ভাবতে হয়, কেমিকৌশলে পড়লে আমি সেদিকে ছুটতে পারব স্নাতকোত্তরে। তারপরে আসে পুষ্টি প্রতিষ্ঠানে পড়ার কথা। আমি আবারও আবিষ্কার করি, আমার সেই স্বপ্নগুলোর আরো কাছে এই বিষয়টা পৌঁছে দিতে পারে। কখনো লজ্জা হত, কারন এদেশে বিষয়টার নামে গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে খুব করে পড়াশুনা হয়। ছেলে হয়ে সেখানে কে যায়?

সেই প্রতিষ্ঠানে প্রথম দিনটায় ঢুকেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। আমি আমার মন ভালো হওয়ার হাঁটা শুরু করি এদিক ওদিক। আমার যখন মন ভালো থাকে, কিংবা খারাপ থাকে, আমি তিন-চার কিলোমিটার হাঁটি শহরের রাস্তা ধরে।

কয়েক বছর আগে আমি আঙ্গুল গুণে বের করেছিলাম, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারি, তবে স্নাতক শেষ করে বের হব যখন, তখন একশ বছর বয়স হবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। আমার কাছে স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু মনে হতে থাকে সেটাকে। আমি এখন সেই স্বপ্নের খুব কাছে।

পাঠ পরিকল্পনা হাতে পাবার পর শেষ লজ্জাটুকুও আমার দূর হয়, এখানে ঘরোয়া পুষ্টি প্রকল্প নিয়ে পড়তে আসিনি আমি। অণুজীববিজ্ঞান, রসায়ন, ব্যাবচ্ছেদ বিদ্যা, অর্থনীতি, মানব পুষ্টি, শরীরবিদ্যা, জীব-রসায়ন এর মত সব বিষয়ই পড়তে হবে এখানে। নেই ঘরোয়া পুষ্টির একটুখানি পড়াও। পাবলিক হেলথ এর পড়াও অনেক। পড়তে শুরু করলাম, এবং এবছরের জন্য পড়াশুনার কথা এখানেই শেষ।

প্রথম দুয়েকটা দিন অনেকটা চুপ করেই কাটে। তারপর শুরু হয় নানারকম আনন্দ। আমরা ধীরে ধীরে অনেককে তুই বলতে শিখি। ক্লাস করে হাঁটতে হাঁটতে টিএসসিতে গিয়ে বসি। অনেকক্ষণ করে গল্প করি, আর মাঝে মাঝে দুপুরে খেতে বসি ক্যাফেটেরিয়ায়। সেই অল্প একটু ভাত, একটুখানি আলু ভর্তা, আর মুরগির মাংস। মুরগির প্রতিটি টুকরো এত ছোট হতে পারে কখনো ভাবিনি। মাঝে মাঝে খেয়েছি এমন ছোট টুকরোর রান্না, তবে অন্ততর পাঁচ-সাত টুকরো। কখনোবা গলার এক টুকরো পরে পাতে। ঝোল থাকে স্বচ্ছ, বাটি ভরা। তাই দিয়ে আধপেট খেয়ে বলি, হল তো লাঞ্চ, এবার আড্ডায় বসি।

প্রথম দিককার আড্ডায় পাই ছেলেদের দল থেকে শ্রাবণ, মিলন, তানজির, জায়েদ আয়াতদেরকে। আর মেয়েদের মধ্যে অন্তরা, আমেনা, রিংকি, মীম। প্রথম দুয়েক সপ্তাহ এর আড্ডায় ঘুরেফিরে এই কজনের সাথে আরো দেখা যায় অনেককে। আস্তে আস্তে আড্ডার প্রবণতা আর বাড়ে। সবাই যোগ দিতে শুরু করে আড্ডায়। আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে কাটাতে শুরু করি আমাদের সময়গুলো।

এর মধ্যেই চলে আমার অনেক পছন্দের কাজ। বিজ্ঞান লেখা, এদিক ওদিক ছুটে বেড়ানো থাকে মূল আকর্ষণ। 

[অসমাপ্ত! আমি দুঃখিত, একটা লেখা ছেড়ে একবার উঠলে, মন খারাপে কিছু সময়ে ডুবলে সেটা আর কখনো লেখা হয়ে ওঠে না। এটা আর কখনো লেখা হবেনা। এরকম কিছু ডায়েরি ঘেটে পরে কখনো লিখব। ] 

শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

অভিমান



স্মৃতিসৌধের শেষ মাথায়, কয়টা পলাশ গাছ আছে। পলাশের বসন্ত ভালো লাগে। তাই হয়ত বসন্ত এলে রাস্তাটাকে সে চাদরে ঢেকে দেয়। লেকটা যেখানে ঘুরে গেছে, সেখানটায়ই গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বসন্তে এই এলাকাটা একদম কমলা হয়ে থাকে। সেই কমলা চাদরটার টানেই হয়ত প্রতি বসন্তে নিয়মিত এসে বসে থাকি জায়গাটায়। এবছর শুরুটাই করলাম শীতে।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। এপাশটা ভোর, সকাল, সন্ধ্যা; সবসময়েই নির্জন। হয়ত শুধু পলাশ ফুল না, নির্জনতাটাও আমাকে টানে। এক দিকে ফিরলে জল দেখতে পাব, সেখানে শাপলা কিংবা পদ্ম ভাসবে, অন্যদিকটায় ফিরলে ডাঙ্গা দেখতে হবে, তবে সে ডাঙ্গা ছেয়ে আছে পলাশে। তাই আমি লেককে উপেক্ষা করে অন্যপাশে ফিরে থাকি। আজও তেমনটা আছি।
যাবেন?
কোমল স্বরের একটা নারীকণ্ঠ। এক শব্দের বাক্যে মায়াবি একটা টান আছে। টানটা এত বেশি, অন্যমনস্কতা টুপ করে বলিয়ে বসতে পারে, যাব। আমি তবু তাকালাম।

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ঝরকে ঝরকে ঝরিছে বকুল



 “সব ছেড়ে চলে এলে?”
“এলাম।”
“তুমি তো বলতে তুমি নৈরাশ্যবাদী, ভীতু।”
“তবু তো এলাম। ওটা বকুলের মালা নাকি?”
“হু। দেখেছ কেমন সুবাস?”