শনিবার, ১৩ মে, ২০১৭

আ জার্নি টু বোলপুর



এক.
আমি বেশ উত্তেজিত হয়ে প্রিন্ট করা একটা পৃষ্ঠা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম ছাদে। ওপাশে প্রীতি খেলছে আর দুটো ছোকরার সাথে। আমার সেদিকে মন নেই। আমি অপেক্ষা করছি মিমির জন্য। বলেছি সোজা ওপরে চলে আসতে, ক্লাস শেষেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সের সহকারী অধ্যাপক সে। আমি এই মূহুর্তে অকর্মার মত ঘরে বসে আছি। ফুলার রোডে শিক্ষক ভবনে থাকছি আমরা প্রীতির জন্মের পর থেকেই। মিমি ছাদে ঢুকল, ধীর-স্থির ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, দারুণ খবরটা কি শুনি? 
আমি ভাবলাম, খানিকটা রহস্য না করে পারা যায় না। হাসলাম। ছেলেবেলা থেকে মিমির যে একটাই অভ্যাস, গুনগুন করে বলা, 'অসভ্য!' সেটা বলে ও আমার হাত থেকে কাগজটা কেড়ে নিল। একটুক্ষণ চোখ বুলিয়ে হাসল, 'আবেদন করবে?'
কাগজটা ছিল একটা চাকরির বিজ্ঞাপন। বিশ্বভারতীর পল্লীশিক্ষাভবনে। ওদের এগ্রো কেমিস্ট্রি বিভাগে দুজন অধ্যাপক নিচ্ছে, মূলত গবেষণার কাজে। 'বেশ তো, করো আবেদন!' এটুকু বলেই ও চেঁচাল, রাণী... রাণী... প্রীতি দৌড়ে এল। মায়ের কোলে ঝপিয়ে পড়ল। আমাদের একমাত্র মেয়ে এই প্রীতিলতা। বয়স চার এর একটু বেশি। বড় দুরন্ত হয়েছে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর নামে রাখা ওর নাম। এই নাম নিয়ে কম ঝামেলা হয়নি বাড়িতে।

বুধবার, ১০ মে, ২০১৭

শুয়োর কা বাচ্চা


এক.
সালেহ মিয়ার দোকানটা ছোট। চায়ের দোকান সেটা। চা-রুটি-কলা বেচে কুলায় না। তাই সুঁই, কলম, চুলের খোপা জাতীয় অনেক কিছুই উঠিয়েছেন তিনি। তবু সেটা মুদি দোকান হয়ে উঠতে পারেনি। বসতভিটের সামনে টিনের ছোট ঘর তুলে বানিয়েছেন দোকানটা। তবে চারটে বাড়ি পরেই মণ্ডল ব্যাপারীর মুদি দোকান। সব রসদ সেখানেই আছে। অল্প পুঁজিতে সালেহ মিয়ার যা ওঠানোর সাধ্য, তাতে মানুষ টানবে না। অগত্যা এটুকু দিয়েই চলতে হয়। তবে পাশেই প্রাইমারি স্কুল, ওপাশে ব্রাক স্কুল। ছেলেমেয়েরা এক টাকা-দুই টাকা নিয়ে দৌড়ে আসে প্রায়ই। ক্লাসের মাঝে, টিফিন পিরিয়ডে, এমনকি ক্লাস শুরুর আগেও ভীড় লেগে থাকে ছেলেপেলের। তবে তাতে আর কত আয়? বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই দিনে পায় দুই টাকা, খুব অল্প কজনই পাঁচ টাকা। অনেকে কখনোই বাড়ি থেকে টিফিন খরচ বলে কিছু পায় না। বাড়িটাও ছোট। যা কিছু চাষ হয়, ছোট পুকুরে যা মাছ হয়, তা খেয়ে পরে বেচার উপায় নেই। 

সালেহ মিয়ার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। রোদে পোড়া মুখ, ভ্রু ঘন, কপালে এর মধ্যেই ভাজ পড়েছে। লম্বাটে মুখে সবসময় যেন রাজ্যের ক্লান্তি লেগে আছে। তিন মেয়ে তার। বড়টা ক্লাস এইটে পড়ে, মাঝেরটা ব্রাক স্কুলে এবার যাওয়া শুরু করল, আর ছোটটার বয়স দুই বছর। সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য বলে কিছু নেই বহু বছর হল। টানাটানি নেই, এমন কখনো যায় না। এক টুকরো জমিও নেই যে ফসল উঠলে মুখে হাসি ফুটবে। একটা গাভীর জন্য বড় সাধ। মেয়েগুলো বছরে একটা দিনও দুধ খেতে পায় না। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ দেবার কথা বলে যে আপারা বাড়ীতে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনিয়ে যায় প্রায়ই, তাদের ওপর ঠিক ভরসা করতে পারেন না তিনি। সুদের বোঝা বড় ভারী। ও পাড়ার এক বউ নিয়েছিল ঋণ। গরুই কিনেছিল। সাপে কামড়াল গরুটাকে, সেই সুদ সামলাতে এক টুকরো জমিই বেচতে হয়েছিল ওদের। 

বড় মেয়েটার নাম কমলা। তরতর করে বেড়ে উঠছে সে। এরমধ্যেই গ্রামের ছেলেরা আড়চোখে তাকায়। বাপের মত লম্বাটে মুখই পেয়েছে মেয়েটা। চিবুক যেন অনেকটা সুঁচালো। চোখগুলো বড় বড়, দেখলে মায়া পড়ে যায়। বিয়ের কত প্রস্তাব আসে। কিন্তু সালেহ মিয়া ফিরিয়ে

শনিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৭

স্বস্তি



অয়ন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, কেমন করে হল এসব? হরতালে সামনে এগিয়ে বড় একটা ইটের টুকরো ছুড়ে মেরেছিল পুলিশের দিকে, এবং কি সৌভাগ্য! এক পুলিশের হেলমেট ছিল না মুখে, ইটটা গিয়ে তার মুখেই লেগেছিল। ঝরঝর করে রক্ত বেরিয়ে এলো, নাকটাও গেল বোধহয় বেচারার। ও হঠাৎ বিচলিত বোধ করছিল। সাধারণত বাম দলগুলো হরতালে নিরাপদ দুরুত্বে থেকে ইট-পাটকেল ছোড়ে, কিন্তু কেউ কারো ধরাছোঁয়ার ভেতরে যায় না। কাউকে আঘাত করার মনোবাঞ্ছা পুলিশের নেই, বিপ্লবিদেরও নেই। এর মাঝখানে একদম পাশে এক কাঁদানে গ্যাসের শেল পরায় কিছুক্ষণ মুখ থুবড়ে পরে ওকে খক খক করে কাশতে হয়েছিলো। অন্য একজন মুখের সামনে লাইটার জ্বেলে খানিকটা সুস্থ করে দেয়। সেটা সামলে ওঠার পরই অনেক বেশি রাগ নিয়ে তেড়ে গিয়েছিল অয়ন। গুলি খাওয়ার আগে ফিরেও আসতে পেরেছিল আড়ালে। কিন্তু জলপাই রঙের পাঞ্জাবিটা। সেটা পুলিশদের চোখে আটকে ছিল। দুপুরের আগে আগে হঠাৎ ধাওয়া করে এসে ধরে ফেলেছিল। রাস্তার ওপরে রাইফেলের বাটের আঘাতে জ্ঞান হারিয়েছিল অয়ন শীঘ্রই। তবে কাল ইউটিউবে সেটার ভিডিও দেখে থমকে গিয়েছিল ও। জ্ঞান হারানোর পরে আট-দশজন পুলিশ ওকে বেধড়ক পিটিয়েছে। কোন এক পথচারীর মোবাইলে সে দৃশ্য ধারণ না হলেও হয়ত হত। অসুস্থ অবস্থায় পুলিশ ওকে হাসপাতালে দিতে চায়নি, চেয়েছিল চৌদ্দ শিকে ভরতে। কিন্তু পথচারীদের বাধায় ওকে আনা হয়েছে ঢাকা মেডিকেলে। পরদিন খোঁজ-টোজ নিয়ে পুলিশ যখন বুঝতে পেরেছে, কোন দলেই নেই ও, তখন অবাক হয়েছে, এবং মামলা না করেই চলে গেছে। এসব ইস্যুতে দলের লোক ছাড়া ধরে লাভ নেই। ছাত্রদের দু-তিনটে বাম সংগঠনও ঘুরঘুর করে চলে গেছে। দলের ফায়দা নেই, নিউজ ভ্যালু নেই এখন আর, তো হবে কী পাশে থেকে? 

এসব তিনদিন আগেকার কথা। এখন সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যাথা, কিন্তু হাড়গুলো সব অক্ষত। পুলিশ কি আজকাল এনাটমি পড়ে? নিখুঁতভাবে কেমন করে পেটায় ঐ হুড়োহুড়ির মধ্যে? মাথায় আর উরুতে ছাড়া কোথাও ব্যান্ডেজ নেই। ফুরফুরে মেজাজে সোভিয়েতভ কৌতুকভ পড়ছিল। এসময় মিমি এল। মুখ থমথমে, ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে বসল নিজে। এই তিনদিনে মিমি আসতে পারত, কিন্তু কেন যেন আসেনি। হয়তবা এই অবস্থা দেখতে চাচ্ছিল না। ফুরফুরে মেজাজ উবে গেল ওর মুখে ঝড় দেখে। নিঃশব্দতা ভাঙল একটু পর।
-না গেলে কী হত?
-গ্যাসের দাম বেড়ে যেত।
হেসে ফেলল মিমি। এমন সরল উত্তর আশা করেনি। মিমির মুখে মেঘ জমলেই আয়নের মুখে খই ফোটে। নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে সে। কিন্তু আজ এমন সোজাসাপ্টা কৌতুক! ব্যাগ থেকে একটা কাগজের ঠোঙ্গা বের করে দেয় মিমি। রোগী দেখতে এলে ফল-হরলিক্স নিয়ে আসতে হয়,

রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৭

ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল



এক.
ক্লাস শেষ হল, অমনি জারিনের মেসেজ। কার্জনে এসো, লনে। গিয়ে দেখলাম ওর চুল ভেজা। একদম চুপুচুপে। বললাম, ভেজা কেন?
-কেঁদেছি।
-তবে চুল কেন?
-মুখ ধুতে গিয়ে।

আমরা মাটিতে বসলাম। এল বিয়ের কথা। বলল, কাল এলে না কেন?
-পেট ব্যাথা করছিল।
-মগবাজারে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
-কাজী অফিসের সামনে?
-বলো কী! যা রোদ।

তখন ফোনে রাইমার মেসেজ এল, "ল্যাব করছ তো?" যেতে হবে ল্যাবে। পথে কয়েকটা কাঠগোলাপ কুড়িয়ে নিলাম ত্রিপল-ই এর সামনে থেকে। তখন সোহান নামের পিচ্চি ফুলওয়ালা পাশ থেকে যেতে যেতে বলল, 'যেইডা মাগনা পাওয়া যায়, সেইডাই নিবেন!' এই একটু আগেও ছেলেটা আমাকে জ্বালাতন করেছে, একটা গোলাপের জন্য। কিন্তু শুকনোগুলোও চায় দশ টাকা। ল্যাবে গিয়ে দিলাম রাইমাকে, ও সেটা ব্যাগে রাখল, সাথে বলল, 'খাবার আনলেই তো হত!'

এই আমার দুই প্রেমিকা। আমরা বিয়ে করছি। আমি এবং রাইমা, আমি এবং জারিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, দুজন শিক্ষার্থী বিয়ে করে ফেললে নাকি তারা থাকতে পারে ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে। হলে চল্লিশ জনের গণরুম দেখে আমি ক্লান্ত। ওখানে থাকা যায় নাকি? আমার শখ, দুটি বিয়ে করে দুটি রুম নেব, একরুমে থাকবে দুই সতিন (সুফিয়া কামালে রাইমার রুম নম্বরও যে ২০৩!), অন্য রুমে আমি একা। কারণ গণরুমে আছে ছারপোকার উৎপাত! তবে শ্রাবণ বলে, 'এখানে ছারপোকা, ওখানে উকুন। আপনি কোনটা চান?'

আগামী সপ্তাহে, সোমবার বিকেলে বিয়ে করব আমি আর রাইমা। এই বুধবার সকালে আমাদের ব্যাচেলর জীবনে শেষ ডেট। ক্লাসটা মিস দিতে হবে, তারচেয়ে কষ্টের,

শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

আবার তুমি সাহসী হও

Image result for only thing is to fear
"...আর আজ কিন্তু এসব নিয়ে আমি কাঁদিনি।  বললাম না আমি সাহসী হয়েছি অনেক।
আমি এজন্য আগে ভালবাসতে ভয় পেতাম ..."


সাহস কী? সাহস কি এই তৈরী হয়, এই উবে যায়? তোমার সাহস কি আবার উবে গেছে? এই যে দিনের পর দিন দুঃখে থাকতে, কষ্ট হত না? সেসব থেকে কি একটাবারও বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে হয়নি? সাহসের দরকার ছিল, এইটুকু তোমার সাহস? যেটা এক সপ্তাহ পর উবে যায়? 

ভাষা, ভালোবাসা





আমার নানারকম স্বপ্ন আছে। সেসব কাজ করে নানাভাবে। শখের বশে স্বপ্ন বুনি আমি, এরপর ছুটি তার পেছনে। তেমনি কোন একদিন মনে হয়েছিল ভাষা শিখব। অনেক অনেক ভাষা শেখার ইচ্ছা তখন দানা বেঁধেছিলো। কেন ভাষা শিখব আমি জানতাম না তখন, কিংবা এখনো। একেক সময় একেক ভাষার কথা ভাবি, হয়ে ওঠে না শেখা। 

জন্মের পর থেকে শিখেছি বাংলা। পড়তে আর লিখতে শিখেছি। বলতে পারিও বেশ। কারণ এটা আমার মাতৃভাষা। এরপর আর অনেক ভাষা শিখতে হবে, তখন জানতাম না। তবে সেই শৈশবে অক্ষর চেনার পর নিজে নিজে উচ্চারণ করে পড়তে, লিখতে শিখে গিয়েছিলাম আর দুটো ভাষা। ইংরেজি আর আরবি। অনেক পরে এসে হয়ত সেটা কাজে দিয়েছে, অন্য ভাষা শেখার সাহস যুগিয়েছে মন নিজেকে। আরেকটু পরের বয়সে ঊর্দু অক্ষরটা চিনতাম, লিখতে পারতাম। পড়তে কষ্ট হত, কারণ ঊর্দূর ফন্টগুলোকে আমার মনে হত আরবির বাজে হাতের লেখা সংস্করণ। এসব গল্প বয়স আট হবার আগের।

আমার কাছে আমার স্বপ্ন বড়, তাই মূল গল্প সেটাই, যেখানে স্বপ্নের কথা শুরু। একটু বয়সে যখন অনেক বই পড়লাম তখন ভাবলাম ভাষা শিখতে হবে আমাকে। শিখতেই হবে। ইচ্ছে হল তাই শিখতে হবে। কিংবা তখন যত বই অনুবাদ পড়তাম, সেগুলো আসল ভাষায় পড়তে ইচ্ছে হত। আর আগ্রহ ছিল প্রাচীন লিপির প্রতি। অসুস্থ থাকতাম অনেক বেশি, একটা সময়ে যেতাম ঢাকা মেডিকেলে। সেসময়ে মায়ের সাথে দুটো জায়গায় যাওয়ার অভ্যাস ছিল হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে। জাতীয় জাদুঘর, কিংবা পাবলিক লাইব্রেরী (শিশু পাঠকক্ষ, যেটার নাম সম্ভবত সুফিয়া কামালের নামে)। জাদুঘরে অনেক সময় নিয়ে দেখতাম বাংলা লিপির বিবর্তন। বুঝতে চেষ্টা করতাম কেমন করে শেখা সম্ভব। কিন্তু যত শিলালিপি সংরক্ষিত থাকত, তার কিছুই ঐ বর্ণ ব্যবহার করে লেখা না। সব ফার্সী, পর্তুগিজ, কিংবা আরো প্রাচীন কিছুতে লেখা। সেসব আর বোঝা হত না। 

শনিবার, ১ এপ্রিল, ২০১৭

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে


রাতে, যখন প্রজাপতি তারাটা ডুবে যায়, তখন আমার রাত শুরু হয়। তার আগ পর্যন্ত মানতে কষ্ট হয়, আমি বেঁচে আছি। নিজেকে অপমান করতে ইচ্ছে হয়। এসব খেয়াল। প্রয়োজন নেই এসবের। আমার প্রয়োজন স্বেচ্ছাচারী হয়ে বেঁচে থাকা। স্বেচ্ছাচারিতা আমাকে আনন্দ দেয় না, দুঃখ দেয়। তবে সেটা আমাকে আর সবার সাথে তাদের মত হয়ে মিশতে সাহায্য করে। এমন করে দেয়, যাতে কিছু কাছের মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে বলতে পারে, "কটা দিন আগেও তুই অনেকটা ভালো ছিলি। এখন কেমন যেন হয়ে গেছিস।" এই যে কয়টা দিন আগের গল্প, সেটা চলছে, এবং চলতে থাকবে অনেকক্ষণ, অনেকটা বছর ধরে, বারবার। নানা জনের কাছ থেকে নানাভাবে এই বাক্যটা শুনতে শুনতেও অভ্যস্ত হতে পারিনি। অস্বস্তি নিয়ে বারবার শুনছি, শুনে যাচ্ছি।
এই আকাশে আমার কি মুক্তি আদৌ আছে? আমার আকাশগুলো সবসময়ে ঝাপসা হয়ে আসে এসবে, এসব দুঃখে। আমি কোনগুলোকে আলো বলব? কোন আলো তো কোথাও সেকেলে, কোথাও অন্ধকার। আলোর খোঁজ তবে কেমন করে করতে হয়? আমাকে জানতে হবে।

সোমবার, ২০ মার্চ, ২০১৭

দুঃখ-হিংসা-বেদনা

প্রেম শব্দটা সত্যি গোলমেলে। ঠিক কতটুকুকে আমরা প্রেম বলব, কতটুকুকে ভালোবাসা বলব, তার কোন মাপ নেই। আর সেই মাপের প্যাচের অভাবেই সবকিছুর সীমানা ওভারল্যাপিং করে বসে আছে। আমরা সেই সীমানার খোঁজে আকুল হই। বন্ধুত্ব আর প্রেমের ব্যাপারটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমরা ছাঁচে বাধতে চাই, আলাদা করতে চাই। কিন্তু এটা কতটা আলাদা? ফ্রয়েডিয়ান সাইকোলজির যে অংশগুলো নিয়ে আমরা কৌতুক করে থাকি, সে অংশগুলো আমার মানতে ইচ্ছে করে। এগুলো আলাদা করা খুব কঠিন।

হিংসা দিয়ে হয়ত বোঝা যাবে। পছন্দের মানুষকে অন্য কারো সাথে প্রেমালাপে মত্ত বা সেরকম কিছু দেখলে বুক কষ্টে ফেটে যায়। এখানে ফ্রয়েড একদম ঠিক। এই যে এমা ওয়াটসন, রুপার্ট গ্রিনকে যে দৃশ্যে চুমু খায়, আমার সত্যি বুকে ব্যাথা করছিল। কাউকে কারো সাথে দুষ্টুমির ফ্ল্যার্ট করতে দেখলেও ইচ্ছে হয় চুবিয়ে মারি ছেলেটাকে।

শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

সিরিঞ্জ


'হ্যালো রুদ্র!', ফোনের ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর।
রুদ্রের মনে পড়ে যায় অনেক পুরনো একটা বাক্য। 'তুমিইতো রুদ্র, যে দৌড়াতে পারে'। একজনের পরিচয় হিসেবে দৌড়াতে পারা বেশ অস্বস্তিকর। রুদ্রের একটা পদক আছে জাতীয় স্প্রিন্টে। তাই বলে দৌড়াতে পারে- এমন করে অপরিচিত একটা মেয়ে বলে বসলে বিরক্ত হবার কথা তার। কিন্তু রুদ্র বিরক্ত হতে পারেনি সেদিন। তবে আজ সন্ধ্যার একটু পরে ব্যাচেলর ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়া সেই পুরনো কণ্ঠস্বর কিছুটা বিরক্তি জাগায়। রুদ্র ছোট্ট করে উত্তর করে, 'বলছি'। ওপাশ থেকে টেনে টেনে কণ্ঠস্বর বলে, 'আমি মিলি'। মিলির পরিচয় ঠিক এখানে শুরু নয়। ফিরতে হবে সেই দিনে। সেদিনও একটা কণ্ঠস্বর ছিল এই মিলি। পেছন থেকে বলেছিল, 'তুমিইতো রুদ্র, যে...'। সেটা ছিল বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র উৎসব, পাবলিক লাইব্রেরীর শওকত ওসমান মিলনায়তনে। চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র, আর পেছন থেকে ডাক শুনেছিল মিলির। আজ যেমন 'চিনেছি' বলার আগে বিরক্তি কাটাতে রুদ্র একটু সময় নেয়, সেদিনও এরকম সময় নিয়েছিল। কৌতূহল কাটাতে। এরপর ধীরে ধীরে ঘুরে তাকিয়ে বলেছিল, 'হ্যাঁ। এবং আমি হামাগুড়ি দিতেও জানি'।

'মার্কস লোকটা কেমন?' ফোনের ওপাশ থেকে কথা শুরু হয়।

বুধবার, ৮ মার্চ, ২০১৭

নারী দিবসঃ আমার শ্রদ্ধা আমার ভাবনা


আমার ভাবির যেদিন মেয়ে হয়, সেদিনকার কথা। আমি শুনলাম কথাটা, অনেক দূরে বসে, এবং ধ্বক করে উঠল বুক। মেয়ে! আবারো সেই ভোগান্তি!
আমাদের জন্য ভোগান্তি নয়, কিন্তু আমি যতই অস্বীকার করি, আমার প্রিয়তমা ভাতিজীর জন্য সেটা ভোগান্তির হবেই। ওর জীবনের নানারকম কষ্টের একমাত্র কারণ হবে ও নারী। এবং সেই কষ্টগুলোর প্রতিটির পেছনে কাজ করবে অন্য কারো অন্যায়। আমরা সেটা সহ্য করব। প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে সয়ে আসছি।

বাণী গল্প রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন যেভাবে-
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব'লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।
তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই-- আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।
 

আচ্ছা, একটা বখাটের দল যখন রাস্তায় হেঁটে যাওয়া একটা মেয়ের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে, তখন মেয়েটার কেমন লাগে? আমি সাইকোলজির ছাত্র নই, আমার ওসব বোঝার সত্যিকারের ক্ষমতাটা নেই। আসলে, পুরুষ হয়ে জন্মানোয় আর কখনো ওটা জানার সুযোগ হবে না। এবং এই বিশ্রী স্বাদটা নেবার ইচ্ছে কারো শখে জাগবেও না কখনো। কিন্তু সেই পুরুষগুলো? যাদের চোখ জ্বলজ্বল করে, কিংবা ঠোট ভিজে ওঠে? ওদের কখনো মনে হয়েছে কথাগুলো?

ভারতীয় একটা সাইটে দেখলাম ওঁরা লিখেছে,
মেয়েদের এটা করা উচিৎ না,
মেয়েদের ওটা করা উচিৎ না...
আসলে মেয়েদের এসব চুতিয়াদেরকে জন্ম দেয়াই উচিৎ না যারা এসব বলে। 

এটা তাঁরা ছেপেছে কৌতুকের মত করে ইলাস্ট্রেশন করে। আসলে মেয়েরা মা হন বলে তাঁরা এত মহৎ হয়ে পড়েন। যে ছেলেটা ঐসব অশ্লীল কথা সাবলীল ভঙ্গিতে বলে যেতে পারে সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেয়েটাকে নিয়ে, তার কখনো মনে পড়ে না, তার মা একসময় তরুণী ছিলেন, এবং তার মত অনেক ছেলেরা ঠিক ঐভাবে ঐ মন্তব্যগুলো করেছে তাঁকে নিয়ে। সেই মা কখনো জানতে পারেন না, তরুণী থাকতে যে শব্দগুলো তাঁকে সবচেয়ে কষ্ট দিয়েছে জীবনে, সেই শব্দগুলো তাঁর ছেলে বাইরে অবলীলায় উচ্চারণ করে কোন মেয়েকে কুঁকড়ে দিয়ে অট্টহাসিতে মেতে উঠেছে, এবং ঘরে এসে অবলীলায় ভাত গিলছে। মায়ের কথাটা ভাবলে হয়ত ভাতগুলো গলায় আটকে যেত। 

সাম্যতা বা স্বাধীনতার অর্থ কিন্তু আমরা আজকাল প্রায়ই গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু সেই গুলিয়ে ফেলবার অনেক আগে, একদম শুরুতেও কিন্তু আমরা বৈষম্য টেনে আনি। ধরুন আমার বাবা যদি আমাকে আজ ফোন করে বলেন, 'তুমি লিখেটিখে কিছু টাকা পাও না? আগামী মাসে আমাকে দেড় কোটির মত টাকা দিও তো, জমি কিনব একটা।' আমি কি তখন হাসব? আমাকে যদি বলা হত ভাতিজার জন্য চিপস কিনে এনো, কিংবা মায়ের জন্য এক কেজি আপেল এনো, সেটা স্বাভাবিক ছিল। সেটা হয়। কিন্তু কেমন করে আমি দেড় কোটি জোগাড় করব? সামর্থের প্রশ্ন আসে এতে। কিন্তু সেই সামর্থ্য কি আমার আছে? এক মাসে সেই টাকা জোগাড় করার মত সামর্থ্যও কি আমার আছে?  নেই। আমরা সাম্যতার বিচার করব শারিরীক-মানসিক সামর্থ্য দিয়ে।